আজকে আমরা আলোচনা করবো ডেঙ্গু (Dengue) কি? বর্তমান সময় করোনা মহামারিতে গোটা বিশ্ব হতচকিত। এরই মাঝে প্রকট আকারে দেখা দিচ্ছে ডেঙ্গু নামক প্রাণঘাতী এক ভাইরাস।

ডেঙ্গু-dengue

এ ধরণের অদৃশ্য ভাইরাস যেন সেই মহান স্রষ্টার অপার মহিমার এক নিদর্শণ দিচ্ছে। কখনও কি একটিবার ভেবে দেখেছেন,

এত ক্ষুদ্র্র একটি ভাইরাস যা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও স্পষ্ট নয়। তার জন্য গোটা বিশ্বের কি দশা হয়েছে?

[আল্লাহ্ আমাদের প্রাণঘাতী এই মহামারী থেকে হেফাজতে রাখুন]

ডেঙ্গু, করোনা নামক ভাইরাসের মতই একটি মারাত্মক ভাইরাস। আমাদের এই ভাইরাসের হাত থেকে নিরাপদ থাকার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

আজকে আমরা আলোচনা করব ডেঙ্গু কি? এটি কি কোন ছোঁয়াচে রোগ? যদি ভাইরাসই হয়ে থাকে তবে কি ধরণের ভাইরাস এই ডেঙ্গু?

সেই সাথে,

ডেঙ্গু কিভাবে ছড়ায়? ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ এবং ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে আমাদের কি করা উচিত? সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ্


শুরুর প্রথমে একটু জেনে নিই যে ডেঙ্গু আসলে কি?

ডেঙ্গু কি? (What is Dengue)

সোজা কথায় ডেঙ্গু হচ্ছে একটি ভাইরাস। এই ভাইরাসের বাহক হল এডিস এজিপ্টিই মশা। এই মশা যখন ডেঙ্গুর জীবাণু কোন মানুষের শরীরে পুশ করে তখন ঐ ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যায়।

বুঝতে পারছেন তো ডেঙ্গু (Dengue) কি এবং ডেঙ্গু জ্বর কাকে বলে?

ডেঙ্গু সাধারণত চার প্রকারের হয়ে থাকে। আর একজন মানুষের কেবলমাত্র ৪ বারই ডেঙ্গু হতে পার।

তবে প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে যে পরিমাণ ক্ষতির আশংকা থাকে দ্বিতীয়বার আক্রান্তের ক্ষেত্রে সেই আশংকা কয়েকগুন বেড়ে যায়।

সব ধরণের জ্বরই কিন্তু ডেঙ্গু নয়। কারও ডেঙ্গু হলে তা কেবলমাত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই জানা সম্ভব।

বর্তমান এই ডেঙ্গু প্রকট আকার ধারণ করায় অনেক মানুষ এই বিষয় নিয়ে বড় উৎকন্ঠার মধ্যে রয়েছে।


এবার দেখি ডেঙ্গু জ্বর আসলে কি?

ডেঙ্গু জ্বর কি?

ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু বহন করে এমন মশা কোন ব্যক্তিকে কামড়ালে সাধারণত ৩-১৫ দিনের মধ্যে তার ডেঙ্গু জ্বর হয়ে যায়।

অনেক সময় এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। আবার কিছু সময় এর লক্ষণ প্রকাশ পায় না।

সুতরাং ডেঙ্গু জ্বর হল ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত জ্বর। আমরা জানি জ্বর কোন রোগ নয় বরং রোগের পূর্ব লক্ষণ মাত্র।

চলুন দেখে নিবেন কয়েক ধরণের ডেঙ্গু জ্বর।

১) ডেঙ্গু ক্লাসিক্যাল জ্বর (Dengue Classical Fever)

২) ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর (Dengue Hemorrhagic Fever)

৩) ডেঙ্গু শক সিনড্রোম জ্বর (Dengue Shock Syndrome)

প্রত্যেক ধরণের জ্বরই আমদের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।

সুতরাং শুরুর প্রথম দিকেই আমাদের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

ডেঙ্গু হলে কি খাওয়া উচিত আর কি খাওয়া অনুচিত তা জানতে পড়তে থাকুন…


আপনি আরোও পড়তে পারেন,

করোনাভাইরাস কি? কিভাবে ছড়ায়? কি হতে পারে এর চিকিৎসা?

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

কিভাবে বুঝবেন আপনার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে? তীব্র জ্বর, শরীরে প্রচন্ড ব্যাথার পাশাপাশি নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা যায়।

  • কিছু সময় জ্বরের মাত্রা বেড়ে গিয়ে ১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট হয়ে থাকে।
  • হাড়ে, কোমড় এবং পিঠসহ শরীরের অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যাথা শুরু হতে পারে। অনেক সময় ব্যাথার জন্য মনে হয় হাড়গুলো সব ভেঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই এই জ্বরের আরেক নাম ব্রেক বোন ফেভার (Break Bone Fever)।
  • জ্বরের ৪-৫ দিনের মাথায় শরীরের মাঝে লালচে দাগ লক্ষ করা যায়।
  • এ সময় বমি বমি ভাব হতে পারে এমনকি বমিও হতে পারে।
  • খাবার রুচি অনেকাংশ কমে যায়।
  • শরীরের রক্তচাপ (Blood Pressure) হঠাৎ করে কমে যায়।
  • প্রস্রাবের মাত্রা হঠাৎ কমে যায়।
  • শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন হাত পা প্রচুর পরিমাণে শীতল হয়ে যায়।
  • নাড়ির স্পন্দর কমে যায় এবং দ্রুত নাড়ি স্পন্দিত হয়।
  • যদি উপযুক্ত চিকিৎসা না হয় তবে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর কীভাবে হয়? এটি ছড়ায় কি উপায়ে?

ডেঙ্গু ছড়ায় কিভাবে?

প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হচ্ছে মানুষ। স্ত্রী মশা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর রক্তপান করে নিজে সংক্রমিত হয় ও পেটে ভাইরাস বহন করে। প্রায় ৮-১০ দিন পর ভাইরাস মশার দেহের অন্যান্য কোষে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে আছে মশার লালাগ্রন্থি এবং শেষে এর লালায় চলে আসে। সারা জীবনের জন্য আক্রান্ত হলেও মশার উপর এই ভাইরাসের কোন ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে না । এডিস ইজিপ্টি” কৃত্রিম জলাধারে ডিম পাড়তে, মানুষের সবচেয়ে কাছে থাকতে এবং অন্যান্য মেরুদন্ডীদের চাইতে মানুষের রক্ত খেতে বেশি পছন্দ করে।

 উইকিপিডিয়া  [তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া]


ডেঙ্গু কি কোন ছোঁয়াচে রোগ?

ছোঁয়াচে রোগ  বলতে আমরা সাধারণত জানি যে সকল রোগ এক বাহক থেকে অন্য বাহকে ছড়িয়ে পড়ে। যে বাহকের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে; সে কিন্তু আদৌ বুঝতে পারে না যে এ ধরণের মারাত্মক ব্যধির মধ্যে সে পড়তে চলেছে।

তবে কি ডেঙ্গু কোন ছোঁয়াচে রোগ?

জ্বি না, ডেঙ্গু কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। এর মাধ্যমে এক ব্যক্তির দ্বারা অন্য ব্যক্তি সংক্রমিত হয় না। তবে অনেকের মনে বিভ্রান্তি রয়েছে।

তারা মনে করে ডেঙ্গু জ্বর একটি ছোঁয়াচে রোগ। এ ধারণার জন্য তারা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তর ব্যক্তির নিকট পর্যন্ত যায় না।

ফলে সেই ব্যক্তি নিজেকে অসহায় মনে করে। আপনারা জানেন ভালাবাসা পেলে কঠিন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিও কিন্তু সেরে উঠতে পারে।

সুতরাং আমাদের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করা দরকার। আর ডেঙ্গু যেহেতু কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। সুতরাং রোগি থেকে দূরে থাকার কোন প্রশ্নই আসে না।

প্রিয় পাঠক, ডেঙ্গু (Dengue) কি এবং ডেঙ্গু জ্বরের বিষয়ে অনেক কিছুই তো শিখলাম। এবার চলুন জেনে নেয়া যাক এই মহামারী থেকে কিভাবে আমদের Safe রাখতে পারি।


আপনি পছন্দ করতে পারেন,

দাঁত ব্যাথায় করণীয় কি?

ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়

বর্তমান সময় ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ করা জরুরী একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের পর দিন এই জ্বরে আক্রান্ত রোগির সংখ্যা বেড়েই চলছে।

এ অবস্থায় প্রতিকার কিংবা প্রতিরোধের জন্য পদক্ষেপ গ্রহন না করা হলে ভবিষ্যতে এটি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

যেহেতু এই ভাইরাসের বাহক হল এডিস মশা সেহেতু একে নিধন করার জন্যি এই মশার বংশ নির্বংশ করে দেয়া দরকার।

সুতরাং ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের নিচের পদক্ষেপগুলো নেয়া উচিত;

  • ঘরের ভিতর সাজানো ফুলদানি এবং বাহিরে ঝোঁপঝাড়, জলাশয়সহ আশেপাশে যে সকল পরিত্যক্ত জিনিস রয়েছে সেগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দেয়া কিংবা পুঁতে রাখা।
  • মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, পানির পাত্র, কন্টেইনার, এসব পরিত্যক্ত পাত্রে যেন পানি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • বাগানের ছাদে যে টব রয়েছে তাতে নিয়মিত পানি পাল্টান। কেননা এখানে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে পারে।
  • যে পাত্রটি ব্যবহার করছেন তা নিয়মিত মাজুন। কেননা এখানে ময়লা জমে এডিস মশার ডিম পাড়ার সুবিধা তৈরী হয়।
  • হাফ হাতা শার্ট, হাফ প্যান্ট না পড়ে ফুল হাতা শার্ট এবং প্যান্ট পরিধান করা উচিত।
  • নিয়মিত মশা নিরোধক স্প্রে ব্যবহার করুন।
  • প্রতিদিন মশারি টাঙিয়ে ঘুমান।
  • পারলে দু.-একটি তুলসী গাছ রোপন করেন। কেননা এই গাছ মশা তাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
  • মশা নিধনের জন্য গাপ্পি মাছ চাষের ব্যবস্থা করুন। কেননা এই গাপ্পি মাছ মশার বংশ নিধনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

চিকিৎসা

ডেঙ্গু রোগের যাবতীয় লক্ষণ যদি আপনার মাঝে দেখা যায় তবে বিচলিত না হযে বরং এ সময় পর্যাপ্ত পানি পান করুন। শুয়ে পর্যাপ্ত ঘুম দিন।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণে হয়তো পানিশস্বলপ্তা দেখা  দিতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে সেলাইন গ্রহন  করুন।

এ সময় ডাবের পানি একটি আদর্শ পাণীয় হতে পারে। তাই সম্ভব হলে এটি পান করুন।

শুধুমাত্র প্যারাসিটামল সেবন করুন। আর রোগির অবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ  করলে দেরী না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান এবং ডাক্তারের সরণাপন্ন হন।

[আল্লাহ্ আমদের এ ধরণের মহামারী থেকে বাঁচিয়ে নিন। আমিন]

ডেঙ্গু (Dengue) কি? আশা করি এ বিষয়ে আর অজানা রইলো না।

ধন্যবাদ।

 


0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *