বর্তমান সময় ইন্টারনেটের মাধ্যমে চোখের পলকেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ডেটা বিনিময় করা সম্ভব হচ্ছে। আজকে আমরা ডাটা বিনিময়ের দ্রুত মাধ্যম ফাইবার অপটিক ক্যাবল (Fiber Optic Cable) সম্পর্কে জানবো।

 

fiber-optic-cable

 

একভাবর ভাবুন তো!

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার মাইল দূরে আপনার পাঠানো ডাটা কেউ অ্যাক্সেস করতে পারছে ; এটা কিভাবে সম্ভব?

রাতে আঁধো ঘুমে চ্যাটিং করছেন প্রিয় মানুষের সাথে। আপনার মনের কথাগুলো লেখা, ইমোজি, বিভিন্ন সংকেত দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন নিমিষেই।

কখনও এমন চিন্তার উদয় হয়েছে কি; এই যে আপনার পাঠানো তথ্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে কিভাবে পৌঁছায়?

যদি হয়ে থাকে তো পড়তে থাকুন।

এবার চলুন না একটু শর্ট লিস্টে জেনে নিই কি থাকছে আজকের টিউনে?

  • অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল কি (What is Optical Fiber Cable)?
  • প্রকারভেদ
  • এই ক্যাবলের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অংশের বর্ণনা।
  • এই কেবল কি কাজে লাগে?
  • ফাইবার অপটিক ক্যাবল কিভাবে কাজ করে?
  • এই ক্যাবল তৈরীতে কি কি ব্যবহার করা হয়?
  • ফাইবার ক্যাবলের বৈশিষ্ট্য সমূহ।
  • অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের ডাটা স্থানান্তর প্রক্রিয়া।
  • ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সুবিধা-অসুবিধা।

তাহলে চলুন আর দেরী না করে বরং মূল কথায় আসা যাক,

অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল কি? (What is Optical Fiber Cable?)

সহজ কথায় অপটিক্যাল ফাইবার হল এক ধরণের প্রযুক্তি। আর ফাইবার অপ্টিক ক্যাবল (fiber optic cable) হচ্ছে অত্যন্ত সরু, নমনীয় এবং স্বচ্ছ কাঁচতন্তু।

এখনও পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল আলো পরিবহনের জন্য আদর্শ একটি মাধ্যম। সাধারণত বিশুদ্ধ কাঁচ (এক ধরণের সিলিকা) অথবা প্লাস্টিক থেকে এই ক্যাবল তৈরী করা হয়।

তবে মজার বিষয় হল ইন্টারনেটের ৯৯% ডাটা অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। আবার এই ক্যাবল সমুদ্রের তলদেশ দিয়েও ডাটা স্থানান্তর করতে সক্ষম।

সুতরাং ডাটা ট্রান্সমিশনের (data transmission) অন্যতম একটি উপায় হচ্ছে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল। এর মাধ্যমে ডাটা আলোক (light) সংকেতরূপে এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে পোঁছায়।

ফলে বৈদ্যুতিক সিগন্যালের (current) মাধ্যমে ডাটা স্থানান্তর এর তুলনায় বহুগুণ দ্রুত ডাটা স্থানান্তর করা সম্ভব হয়।

আপনি আরও জানতে পারেন,

ইন্টারনেট কি? সুবিধা-অসুবিধাসহ ইন্টারনেটের আদি-অন্ত।

প্রিয় পাঠক, আশা করি বুঝতে পারছেন অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল আসলে কি? এবার আমরা পর্যায়ক্রমে জানবো, অপটিক্যাল ফাইবার তৈরীতে কি কি উপাদান ব্যবহার করা হয়? এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কি কি? এবং সেই সাথে এই প্রযুক্তি আসলে কিভাবে কাজ করে থাকে?


ফাইবার অপটিক ক্যাবল কত প্রকার? (Types of Fiber Optic Cable)

কোরের ব্যাস অনুযায়ী ফাইবার অপটিক ক্যাবল সাধারণত দুই ধরণের হয়ে থাকে।

১) সিঙ্গেল মোড অপটিক ফাইবার

এই ধরণের ক্যাবলগুলোর ব্যাস সাধারণত ৮-১০০ মাইক্রন হয়ে থাকে। একে সিঙ্গেল মোড বলার কারণ হলো,  এখানে শুধুমাত্র একটি লাইনে আলোক সংকেত প্রেরণের ব্যবস্থা থাকে। আর সেই সাথে এটি লেজার সিগন্যাল বহনে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়।

সাধারণত অনেক বেশি দূরত্বে ডাটা ট্রান্সমিশনের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল মোড ফাইবার ব্যবহার করা হয়।

২) মাল্টি মোড অপটিক ফাইবার

এই ধরণের ক্যাবলগুলোর ব্যাস সাধারণত ৬২-১২৫ মাইক্রন হয়ে থাকে।

একে মাল্টি মোড ফাইবার বলার কারণ হলো, এখানে আলোক সংকেত প্রেরণের জন্য অনেকগুলো লাইন পথ থাকে। আর সেই সাথে সব সিগন্যাল একই সাথে গ্রাহক যন্ত্রে পৌঁছে যায়।

লেড ব্যবহারের ফলে খরচ অত্যন্ত কম হওয়ায় বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ক্যাবলই হচ্ছে মাল্টি মোড অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল।


অপটিক্যাল ফাইবারে ব্যবহৃত উপাদান এবং এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ

অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল কিংবা ফাইবার অপটিক ক্যাবল যাই বলেন না কেন একগুচ্ছ সূক্ষ্ম সরু এবং নমনীয় কাঁচতন্তুর সমন্বয়ে তৈরী হয় এই ক্যাবল।

অথবা,

পরিস্কার প্লাস্টিক দিয়েও তৈরী হতে পারে অত্যন্ত মূল্যবান এই ক্যাবল।


ফাইবার অপটিক (Fiber Optic) ক্যাবল এর নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ ৩টি অংশ রয়েছে।

  • কোর
  • ক্ল্যাডিং
  • জ্যাকেট

fiber-cable-components

 

কোর (Core)

আলো পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম কোর তৈরী হয় মাল্টিকম্পোনেন্ট, স্বচ্ছ, নমণীয় এবং সরু কাঁচতন্তু দিয়ে। নতুবা পরিস্কার প্লাস্টিক দিয়েও তৈরী হতে পারে এটি।

কোরের ব্যাস সাধারণত ৮-১২৫ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।


ক্ল্যাডিং (Cladding)

কোরকে আবদ্ধ করে রাখা কাঁচ দিয়ে নির্মিত বাহিরের অংশটির নাম হচ্ছে ক্ল্যাডিং। ক্ল্যাডিং সাধারণত কোর থেকে নির্গত আলোকরশ্মি প্রতিফলনের পর পুনঃরায় কোরে পাঠিয়ে দেয়।

এর ব্যাস সাধারণত ১২৫ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।


জ্যাকেট (Jacket)

জ্যাকেট এর কথা শুনতেই যেন কনকনে শীতের তীব্র ঠান্ডার কথা মনে পড়ে গেলো! কঠিন শীতের মাঝে গায়ে আড়মোড়া দিয়ে জড়ানো শীতবস্ত্র জ্যাকেট যেন আমাদের কনকনে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচিয়ে নেয়।

তবে ঐ জ্যাকেট আর ফাইবার অপটিক ক্যাবলের জ্যাকেট কি একই?

হ্যাঁ অথবা না?

হেই! মাথা ঠিক আছে তো! হ্যাঁ আবার না?

শীতের মাঝে গায়ে জড়ানো জ্যাকেট আমাদের তীব্র ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচায়।

যেখানে,

অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল এ থাকা জ্যাকেট ফাইবার অপটিক তারকে ঘর্ষণ, মরিচা পড়া এবং জলীয় বাষ্প থেকে নিরাপদে রাখে।

সুতরাং দুটোই কিছু না কিছু সেইভ করে। এই অর্থে হ্যাঁ।

অপরদিকে,

দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এই অর্থে না।

বুঝতে পারছেন তো?

ফাইবার অপটিক ক্যাবলে জ্যাকেটের ব্যাস হচ্ছে ৪০০ মাইক্রো মিটার।


ফাইবার অপটিক ক্যাবলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সমূহ (Special Features of Fiber Optic Cable)

  • অপটিক্যাল ফাইবারের গতি আলোর গতির সমান।
  • একই সাথে একাধিক তথ্য প্রেরণ এবং গ্রহনের বিশেষ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • গিগাবাইট রেঞ্জে ডাটা ট্রান্সমিট (data transmit) হয়ে থাকে।
  • শক্তির অপচয় খুবই সামান্য (নাই বললেই চলে)।
  • এই ক্যাবলকে নেটওয়ার্কের ব্যাকবোন (network backbone) বলা হয়ে থাকে।

অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের সুবিধা সমূহ (The Advantages of Fiber Optic Cable)

  • দ্রুত গতি সম্পন্ন যা আলোর গতিতে ডাটা ট্রান্সমিট করতে সক্ষম।
  • নেটওয়ার্কের ব্যাকবোন স্বরূপ কাজ করে এবং বড় ধরণের নেটওয়ার্কে বহুল ব্যবহৃত।
  • ডাটা পরিবহনে শক্তির অপচয় সীমিত।
  • ফাইবার অপটিক ক্যাবলের ওজন কম এবং আকারে ছোট হওয়ায় এটি সহজে বহনযোগ্য।
  • বিদ্যুতের চৌম্বকীয় প্রভাব (EMI) হতে সম্পূর্ণ মুক্ত।
  • বাহিরের স্তর প্লাস্টিকের তৈরী জ্যাকেট দিয়ে মোড়ানো থাকে বলে পরিবেশের তাপ, চাপ, ঘর্ষণ এর ডাটা চলাচলে কোনরূপ বাধার সৃষ্টি করতে পারে না।
  • অনেক দূরবর্তী স্থানে দ্রুততার সাথে ডাটা স্থানান্তরের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের ব্যবহার হয়ে থাকে।

এত্ব সব সুবিধার পরেও এর কিছু অসুবিধা রয়েছে।

চলুন জানবেন,

অপটিক্যাল ফাইবারের অসুবিধা সমূহ (The Disadvantages of Optical Fiber Cable)

  • এটি ডাটা ট্রান্সমিশনের অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি মাধ্যম।
  • একে U আকারে বাঁকানো যায় না বলে, যেখানে অধিক বাঁকানোর দরকার সেখানে ফাইবার অপটিক ক্যাবলকে ব্যবহার করা যায় না।
  • অন্য ক্যাবলগুলো যতটা সহজে ইনস্টল করা সম্ভব অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলকে ইনস্টল করা ততটা সহজ নয়।
  •  অত্যন্ত শক্ত হওয়ার কারণে ফাইবার অপটিক ক্যাবলকে সহজে টুকরা করা যায় না।
  • এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে।

ফাইবার অপটিক ক্যাবলের ডাটা ট্রান্সমিশন প্রক্রিয়া (Data Transmission System of Fiber Optic Cable)

কিভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার? আমরা এবার সেটাই জানার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্।

আমরা জানি টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থার ৩টি অংশ রয়েছে।

ঠিক একইভাবে,

ফাইবার অপটিক ক্যাবলে ডেটা ট্রান্সমিশনের জন্য ৩টি অংশ বিদ্যমান।

১) প্রেরক যন্ত্র (Sender)

২) প্রেরণ মাধ্যম (Medium)

৩) গ্রাহক যন্ত্র (Receiver)

প্রেরক যন্ত্রের মাধ্যমে এনালগ বা ডিজিটাল সংকেতকে মডিউলেশন (modulation) করে আলোক তরঙ্গে রূপান্তরিত করা হয়। অতপর একে ফাইবার অপটিকে পাঠানো হয়ে থাকে।

এবার আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে সেই তরঙ্গ গ্রাহক যন্ত্রে পৌঁছে যায়।

ফটো ডিটেক্টর (photo detector) এবং প্রসেসিং ইউনিট (processing unit) নামক দুটি অংশ গ্রাহক যন্ত্রে থাকে। এদের মধ্যে ফটো ডিটেক্টর ফাইবার অপটিক ক্যাবলের আলোক সংকেতকে ডিটেক্ট করে নেয়।

অতপর প্রসেসিং ইউনিট সেই ডাটাকে মডিউলেশন (modulation), ফিল্টারিং (filtering) এবং অ্যামপ্লিফিকেশন (amplification) এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর নিকট পাঠিয়ে দেয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের ব্যবহার সমূহ (The Uses of Fiber Optic Cable)

বর্তমান সময় যোগাযোগ এবং কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং এর মূল উৎস হচ্ছে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল। এর মাধ্যমে মাটির হাজার হাজার মাইল নিচ দিয়ে ডেটা ট্রান্সমিট করা সম্ভব।

এক নজরে একটু জানার চেষ্টা করি এই ক্যাবল কি কাজে লাগে?

  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে।
  • কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং এর মূল উৎস হিসেবে।
  • মেডিক্যাল স্ক্যানিং এর ক্ষেত্রে শরীরের ভীতরে আলাকিত করে imaging করা হয়ে থাকে।
  • বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামাদির ক্ষেত্রে।
  • সম্প্রচার এর ক্ষেত্রে।
  • সিলিং, টানেল এবং দেয়ালে।
  • অনেক স্থানে যেখানে আমরা সচরাচর দেখতে পাই না।
  • তাপমাত্রা, চাপ পরিমাপের জন্য Sensor হিসেবে কাজে লাগে।
  • সাবমেরিন ক্যাবলে (Submarine Cable) ব্যবহার করা হয়।
  • সিসিটিভি (CCTV), টেলিকমিউনিকেশন (Telecommunication), ইন্টারনেট (Internet), এবং লাইটিং (Lighting) এ ব্যবহার করা হয়।

তো বন্ধুরা, অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আজ না হয় এ পর্যন্তই থাক। আগামীতে দেখা হবে প্রযুক্তির নতুন কোন বিষয় নিয়ে। সে পর্যন্ত ভাল থাকবেন, ‍সুস্থ্য থাকবেন।

শুভ কামনা সেই সাথে,

আল্লাহ্ হাফেজ।

 


তৌহিদুজ্জামান বাবু

A Student of Jagannath University.

0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *